আলঝেইমার রোগের লক্ষণ ও করণীয় প্রিয়জনের স্মৃতি হারানোর আগেই সতর্ক হন
বাবা সেদিন রাতের খাবার খেয়ে ভুলে গেলেন যে খেয়েছেন। পরদিন সকালে পরিচিত রাস্তায় হারিয়ে গেলেন। কয়েকদিন পরে নিজের মেয়েকে চিনতে পারলেন না। — এই ঘটনাগুলো শুধু বার্ধক্যের স্বাভাবিক পরিণতি নয়, এগুলো হতে পারে আলঝেইমার রোগের লক্ষণ ও করণীয় না জানার পরিণাম। বিশ্বে প্রতি ৩ সেকেন্ডে একজন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। সঠিক সময়ে চেনা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
📋 এই ব্লগে যা থাকছে
আলঝেইমার রোগ আসলে কী?
আলঝেইমার রোগ একটি প্রগতিশীল নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ — অর্থাৎ সময়ের সাথে মস্তিষ্কের কোষগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। এটি ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং সমস্ত ডিমেনশিয়া রোগীদের প্রায় ৬০-৭০ ভাগই আলঝেইমারে আক্রান্ত।
রোগটির নাম রাখা হয়েছে জার্মান চিকিৎসক অ্যালোইস আলঝেইমার-এর নামে, যিনি ১৯০৬ সালে প্রথমবার এই রোগের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। মস্তিষ্কে অ্যামিলয়েড প্লাক ও নিউরোফাইব্রিলারি ট্যাঙ্গেল জমে স্নায়ুকোষ ধ্বংস করে — এটিই রোগের মূল প্রক্রিয়া।
চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, আলঝেইমার শুধু স্মৃতিশক্তি হারানোর রোগ নয় — এটি চিন্তা করার ক্ষমতা, ভাষা, আচরণ এবং শেষ পর্যায়ে শরীরের মৌলিক কাজগুলোকেও ব্যাহত করে। তবে সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসায় রোগের গতি কমানো এবং রোগীর জীবনমান উন্নত রাখা সম্ভব।
Alzheimer’s Disease International-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫.৫ কোটি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং প্রতি বছর এই সংখ্যায় প্রায় ১ কোটি নতুন রোগী যোগ হচ্ছেন। বাংলাদেশেও বয়স্ক জনগোষ্ঠী বাড়ার সাথে সাথে এই রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
আলঝেইমার রোগ কেন হয় কারণ ও ঝুঁকি
আলঝেইমারের সঠিক কারণ এখনো সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়। তবে গবেষণায় কিছু শক্তিশালী ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো দুটি ভাগে বিভক্ত পরিবর্তনযোগ্য ও অপরিবর্তনযোগ্য।
অপরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি (যা আমরা বদলাতে পারি না)
- 🔸 বয়স: ৬৫ বছরের পরে ঝুঁকি প্রতি ৫ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়। ৮৫ বছরের উপরে প্রতি তিনজনের একজন আলঝেইমারে আক্রান্ত হতে পারেন।
- 🔸 পারিবারিক ইতিহাস ও জিনগত কারণ: বাবা-মা বা ভাই-বোনের আলঝেইমার থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। APOE-e4 জিন বহনকারীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
- 🔸 ডাউন সিন্ড্রোম: ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আলঝেইমার অনেক আগে এবং বেশি দেখা যায়।
পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি (যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি)
- 🔸 হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমলে স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- 🔸 ডায়াবেটিস: গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস আলঝেইমারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
- 🔸 মানসিক অবসাদ (Depression): দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা আলঝেইমারের একটি পরিচিত ঝুঁকি।
- 🔸 কম শিক্ষা বা মস্তিষ্কের কম ব্যবহার: মস্তিষ্ক যত কম সক্রিয় থাকে, ততই দুর্বল হয়।
- 🔸 সামাজিক একাকীত্ব: একা থাকা মস্তিষ্কের সক্রিয়তা কমায়।
- 🔸 মাথায় আঘাতের ইতিহাস: বড় আঘাত পরবর্তীতে আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়ায়।
💡 জানেন কি?
আলঝেইমার রোগের লক্ষণ প্রকাশের ১৫-২০ বছর আগে থেকেই মস্তিষ্কে পরিবর্তন শুরু হয়। অর্থাৎ যখন রোগী বুঝতে পারেন তার সমস্যা হচ্ছে, তখন আসলে রোগটি অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। এ কারণেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ যত আগে নেওয়া যায়, তত ভালো।
আলঝেইমার রোগের লক্ষণ ৭টি সতর্কসংকেত
সাধারণ বার্ধক্যজনিত ভুলে যাওয়া আর আলঝেইমারের লক্ষণের মধ্যে পার্থক্য আছে। মাঝে মাঝে কারো নাম ভুলে যাওয়া বা চাবি কোথায় রেখেছেন মনে না পড়া — এটা স্বাভাবিক। কিন্তু নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
১. স্মৃতিভ্রম যা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে
সম্প্রতি শেখা তথ্য ভুলে যাওয়া, একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করা, গুরুত্বপূর্ণ তারিখ বা ঘটনা মনে না থাকা — এগুলো আলঝেইমারের প্রাথমিক লক্ষণ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, রোগী সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যান কিন্তু পুরনো স্মৃতি তুলনামূলকভাবে ভালো মনে রাখেন।
২. পরিকল্পনা ও সমস্যা সমাধানে অসুবিধা
রান্নার রেসিপি মনে রাখতে না পারা, বিল পরিশোধ করতে সমস্যা হওয়া বা পরিচিত কাজে সময় অনেক বেশি লাগা — এগুলো প্রাথমিক আলঝেইমারের পরিচিত চিত্র। এটি বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়া নয়, বরং মস্তিষ্কের পরিকল্পনা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফল।
৩. পরিচিত কাজ করতে সমস্যা
পরিচিত রাস্তায় গাড়ি চালাতে না পারা, পছন্দের খেলার নিয়ম ভুলে যাওয়া, বা অফিসের নিয়মিত কাজ করতে সমস্যা হওয়া। যে কাজ আগে অনায়াসে করতেন, সেটাই এখন কঠিন মনে হচ্ছে।
৪. সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি
কোন মাস বা বছর সেটা ভুলে যাওয়া, বাড়ির পথ হারিয়ে ফেলা, বা বুঝতে না পারা যে এখন কোথায় আছেন — এটি আলঝেইমারের একটি গুরুতর লক্ষণ। অনেক সময় রোগী মনে করেন তিনি অনেক বছর আগের কোনো সময়ে আছেন।
৫. ভাষা ও যোগাযোগে সমস্যা
কথা বলতে গিয়ে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া, বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে থেমে যাওয়া, বা পরিচিত জিনিসের নাম মনে না পড়া। যেমন — “ওই জিনিসটা… যেটা দিয়ে লিখি… কী যেন নাম…” এই ধরনের কথা বারবার বললে সতর্ক হওয়া উচিত।
৬. আচরণ ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন
হঠাৎ সন্দেহপ্রবণ হয়ে যাওয়া, অকারণে ভয় পাওয়া, বিষণ্ণ বা উদ্বিগ্ন থাকা, বা একদম পরিবর্তিত মানুষ হয়ে যাওয়া — এগুলো পরিবারের কাছে সবচেয়ে বিপদজনক লক্ষণ। অনেক সময় রোগী পরিচিতদের সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করতে শুরু করেন।
৭. বিচারশক্তি কমে যাওয়া
ফোনে প্রতারকদের টাকা দিয়ে দেওয়া, ঠান্ডায় হালকা পোশাক পরা, বা নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীন হয়ে যাওয়া — এগুলো আলঝেইমারের স্পষ্ট লক্ষণ। রোগী নিজে বুঝতে পারেন না যে তিনি ভুল করছেন।
⚠️ সতর্কতা: স্বাভাবিক বার্ধক্য বনাম আলঝেইমার
মাঝে মাঝে চাবি ভুলে রাখা স্বাভাবিক। কিন্তু চাবি অস্বাভাবিক জায়গায় রাখা এবং চাবির কাজ কী সেটাই ভুলে যাওয়া আলঝেইমারের লক্ষণ। যদি পরিবারের কেউ উপরের একাধিক লক্ষণ দেখান এবং এটি তাঁর স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে — তাহলে দেরি না করে একজন নিউরোলজিস্ট বা জেরিয়াট্রিশিয়ান দেখান।
আলঝেইমারের ৭টি ধাপ
আলঝেইমার একটি প্রগতিশীল রোগ — এটি ধাপে ধাপে বাড়ে। প্রতিটি ধাপ বোঝা পরিচর্যাকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রতিটি ধাপে রোগীর চাহিদা আলাদা।
| ধাপ | নাম | প্রধান লক্ষণ | সাহায্যের প্রয়োজন |
|---|---|---|---|
| ১ | কোনো প্রকাশ নেই | মস্তিষ্কে পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু বাইরে বোঝা যায় না | না |
| ২ | খুব সামান্য পরিবর্তন | মাঝে মাঝে শব্দ বা জিনিস ভুলে যাওয়া | না |
| ৩ | প্রাথমিক পর্যায় | নতুন নাম মনে না রাখা, জিনিস হারানো, কাজে সমস্যা | সামান্য |
| ৪ | মৃদু আলঝেইমার | সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, আর্থিক কাজে সমস্যা | কিছুটা |
| ৫ | মাঝারি আলঝেইমার | নিজের ঠিকানা ভুলে যাওয়া, সাহায্য ছাড়া পোশাক বাছাই কঠিন | বেশি |
| ৬ | গুরুতর পর্যায় | পরিচিত মুখ না চেনা, বাথরুমে সাহায্য দরকার, আচরণ পরিবর্তন | সার্বক্ষণিক |
| ৭ | শেষ পর্যায় | কথা বলতে পারেন না, শয্যাশায়ী, গিলতে সমস্যা | সম্পূর্ণ |
রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়?
আলঝেইমার নির্ণয়ের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা বা যন্ত্রপাতি নেই। এটি মূলত ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের মাধ্যমে করা হয়। তবে কিছু পরীক্ষা রোগ নিশ্চিত করতে এবং অন্যান্য কারণ বাদ দিতে সাহায্য করে।
ডাক্তার সাধারণত রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, পরিবারের পর্যবেক্ষণ, স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা (MMSE বা MoCA test) করেন। এছাড়াও মস্তিষ্কের CT স্ক্যান বা MRI করে অন্যান্য কারণ (যেমন টিউমার, স্ট্রোক) বাদ দেওয়া হয়। রক্ত পরীক্ষায় থাইরয়েড সমস্যা বা ভিটামিন B12 ঘাটতি দেখা হয় — কারণ এগুলো স্মৃতিশক্তি কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আলঝেইমার যত আগে ধরা পড়ে, ততই ভালো — কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে রোগের অগ্রগতি ধীর করা যায় এবং রোগী অনেকদিন স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারেন।
আলঝেইমারের চিকিৎসা ও ওষুধ
দুঃখজনক হলেও সত্য — আলঝেইমার রোগের এখনো কোনো সম্পূর্ণ নিরাময় নেই। তবে বেশ কয়েকটি ওষুধ ও থেরাপি রোগের লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে এবং রোগীর জীবনমান উন্নত রাখতে কার্যকর।
অনুমোদিত ওষুধ
- কোলিনেস্টেরেজ ইনহিবিটর (Donepezil, Rivastigmine, Galantamine): মস্তিষ্কে অ্যাসিটাইলকোলিনের মাত্রা বাড়ায়, স্মৃতি ও চিন্তার উন্নতি করে। মৃদু থেকে মাঝারি পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়।
- মেমান্টিন (Memantine): গ্লুটামেট নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের কোষ রক্ষা করে। মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়।
- Lecanemab (Leqembi): ২০২৩ সালে FDA অনুমোদিত নতুন ওষুধ যা মস্তিষ্কে অ্যামিলয়েড প্লাক কমায় এবং রোগের অগ্রগতি ধীর করে।
নন-ড্রাগ থেরাপি
ওষুধের পাশাপাশি কিছু থেরাপি রোগীর মানসিক অবস্থা ও কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। কগনিটিভ স্টিমুলেশন থেরাপি (ধাঁধা, গান, গল্প বলা) মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। মিউজিক থেরাপি রোগীর মেজাজ উন্নত করে এবং উদ্বেগ কমায়। অকুপেশনাল থেরাপি রোগীকে দৈনন্দিন কাজে স্বনির্ভর রাখতে সাহায্য করে।
পরিচর্যাকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
আলঝেইমার শুধু রোগীকে নয়, পুরো পরিবারকে প্রভাবিত করে। পরিচর্যাকারীরা প্রায়ই নিজেদের স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তি ভুলে যান। কিন্তু একজন সুস্থ পরিচর্যাকারীই পারেন ভালো পরিচর্যা দিতে।
| পরিস্থিতি | কী করবেন | কী করবেন না |
|---|---|---|
| রোগী একই কথা বারবার বলছেন | ধৈর্য ধরুন, প্রতিবার সহজভাবে উত্তর দিন | “এটা আগেই বলেছ” বলবেন না |
| রোগী পরিচিত মানুষ চিনছেন না | নিজের পরিচয় দিন, হাসিমুখে কথা বলুন | রাগ করবেন না বা কষ্ট পাবেন না |
| রোগী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছেন | মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরান, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন | জোর করে আটকাবেন না, তর্ক করবেন না |
| রোগী খেতে চাইছেন না | পছন্দের সহজ খাবার দিন, ছোট ছোট পরিমাণে | জোর করবেন না |
| পরিচর্যায় নিজে ক্লান্ত | অন্যদের সাহায্য নিন, সাপোর্ট গ্রুপে যোগ দিন | একা সব বহন করবেন না |
এছাড়াও, বাড়িকে নিরাপদ করুন — ধারালো জিনিস সরান, গ্যাসের চাবি লক করুন, দরজায় অ্যালার্ম লাগান। রোগীর হাতে একটি পরিচয়পত্র বা মেডিকেল ব্র্যাসলেট রাখুন যাতে নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকে।
আলঝেইমার প্রতিরোধের উপায়
আলঝেইমার সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু জীবনযাপনের অভ্যাস মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখে এবং আলঝেইমারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
- 🔹 মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখুন: বই পড়া, ধাঁধা সমাধান, নতুন ভাষা শেখা, সংগীত চর্চা — এগুলো মস্তিষ্কের সংযোগ মজবুত রাখে এবং “কগনিটিভ রিজার্ভ” বাড়ায়।
- 🔹 নিয়মিত ব্যায়াম করুন: সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাড়ায়। হাঁটা, সাঁতার বা সাইকেল চালানো আদর্শ।
- 🔹 সুষম খাবার খান: মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট (ফল, সবজি, বাদাম, মাছ, অলিভ অয়েল) মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
- 🔹 সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখুন: পরিবার ও বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
- 🔹 পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: ঘুমের সময় মস্তিষ্ক “ওয়াশ” হয় এবং ক্ষতিকর প্রোটিন দূর হয়। প্রতি রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি।
- 🔹 দীর্ঘমেয়াদী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখলে আলঝেইমারের ঝুঁকি কমে।
- 🔹 মানসিক চাপ কমান: দীর্ঘমেয়াদী স্ট্রেস মস্তিষ্কে কর্টিসল হরমোন বাড়ায় যা স্নায়ুকোষ ক্ষতি করে। ধ্যান ও যোগব্যায়াম উপকারী।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া কি একই রোগ?
না, একই নয়। ডিমেনশিয়া হলো একটি সাধারণ শব্দ যা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। আলঝেইমার হলো ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ — প্রায় ৬০-৭০% ডিমেনশিয়া রোগীর মূল কারণ আলঝেইমার। ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, লেউই বডি ডিমেনশিয়া — এগুলো আলাদা ধরনের।
আলঝেইমার রোগের লক্ষণ কত বছর বয়সে দেখা দেয়?
সাধারণত ৬৫ বছরের পরে লক্ষণ দেখা দেয় — এটি “লেট-অনসেট আলঝেইমার”। তবে কিছু ক্ষেত্রে ৪০-৫০ বছর বয়সেও হতে পারে, যাকে “আর্লি-অনসেট আলঝেইমার” বলা হয়। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল এবং প্রায়ই জিনগত কারণে হয়।
আলঝেইমার রোগে রোগী কতদিন বাঁচেন?
রোগ নির্ণয়ের পরে সাধারণত ৪ থেকে ৮ বছর বাঁচেন, তবে কেউ কেউ ২০ বছরও বাঁচেন। এটি নির্ভর করে রোগের তীব্রতা, বয়স, অন্যান্য রোগ এবং পরিচর্যার মানের উপর। সঠিক পরিচর্যায় জীবনমান উন্নত রাখা এবং জীবনকাল বাড়ানো সম্ভব।
আলঝেইমার কি বংশানুক্রমিক?
বেশিরভাগ আলঝেইমার সম্পূর্ণ বংশানুক্রমিক নয়, তবে পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়ায়। প্রথম-স্তরের আত্মীয় (বাবা-মা বা ভাই-বোন) আক্রান্ত হলে ঝুঁকি ২-৩ গুণ বাড়ে। “ফ্যামিলিয়াল আলঝেইমার” নামে একটি বিরল রূপ আছে যা সরাসরি জিনের মাধ্যমে আসে।
পরিচর্যাকারী হিসেবে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য কীভাবে রক্ষা করবেন?
আলঝেইমার রোগীর পরিচর্যাকারীদের বিষণ্ণতা ও “কেয়ারগিভার বার্নআউট” অনেক বেশি হয়। নিজের জন্য সময় রাখুন, অন্য পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিন, সাপোর্ট গ্রুপে যোগ দিন এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিন। মনে রাখবেন — নিজেকে সুস্থ রাখলেই আপনি রোগীকে ভালো রাখতে পারবেন।
বাংলাদেশে আলঝেইমার রোগীর জন্য কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যায়?
বাংলাদেশে এখনো আলঝেইমারের জন্য বিশেষায়িত কেন্দ্র সীমিত। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) ও কিছু বেসরকারি হাসপাতালে নিউরোলজি বিভাগে চিকিৎসা পাওয়া যায়। “Alzheimer’s Disease International”-এর বাংলাদেশ শাখাও সহায়তা প্রদান করে।
🧠 মনে রাখবেন — ভালোবাসাই সেরা পরিচর্যা
আলঝেইমার রোগের লক্ষণ ও করণীয় জানাটা শুধু রোগীর জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্য জরুরি। রোগীর স্মৃতি হারিয়ে যায়, কিন্তু অনুভূতি থাকে — ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অনুভূতি। তাঁকে সেটুকু দিতে পারলেই পরিচর্যা সফল।
পরিবারের কারো মধ্যে সতর্কসংকেত দেখলে লজ্জা বা অস্বীকার নয় দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান। যত আগে ধরা পড়বে, তত বেশি সময় ভালো কাটানো সম্ভব।
সুস্থ থাকুন, প্রিয়জনের পাশে থাকুন।
চিকিৎসা সংক্রান্ত দ্রষ্টব্য: এই ব্লগটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে এবং এটি কোনো পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আলঝেইমার বা যেকোনো স্মৃতিশক্তি সংক্রান্ত সমস্যায় অবশ্যই একজন যোগ্য নিউরোলজিস্ট বা জেরিয়াট্রিশিয়ানের পরামর্শ নিন। BestInMeds.com কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি সরাসরি recommend করে না।
